ঢাকা, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০, ৫ মাঘ ১৪২৭, ৩ সফর ১৪৪২

আল-কোরআন ও হাদীসের আলোকে মিতব্যায়িতা


প্রকাশ: ১৭ অগাস্ট, ২০২০ ১৪:০০ অপরাহ্ন


আল-কোরআন ও হাদীসের আলোকে মিতব্যায়িতা

মুহাদ্দিস আব্দুল গাফফার আল-মাক্কী : মানবচরিত্রের উৎকর্ষ ও উন্নতি সাধনে এবং পাপাচার ও অশ্লীল কাজ থেকে চরিত্রকে যথাযথভাবে সংরক্ষণে মিতব্যায়িতার ভূমিকা অপরিসীম। পক্ষান্তরে কৃপণতা, সংকীর্ণমনা, অপব্যয় ও অপসারী মানব চরিত্র হননের অন্যতম হাতিয়ার। বস্তুত: এ কারণেই মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কোরআন মাজিদে মিতব্যয়ীতার প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন এবং কৃপণতা, অপচয় ও অপব্যয় হতে বিরত থাকার জন্য কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন- আল্লাহর প্রিয় বান্দারা যখন ব্যয় করে তখন অপব্যয় করে না এবং কৃপণতাও করে না। বরং উভায়ের মধ্যবর্তী পন্থা মিতাচার অবলম্বন করে। (সূরা ফুরকান ৬৭)।

এ প্রসঙ্গে হযরত আবূ উমামা (রা) হতে বর্ণিত একটি হাদীসে রাসূল (সা) ইরশাদ করেন-হে আদম সন্তান, তুমি তোমার প্রয়োজন অতিরিক্ত সম্পদ দান কর, তা তোমার জন্য কল্যাণকর এবং এ সম্পদ কুক্ষিগত করে রাখার তথা কৃপণতা করা ক্ষতিকর এবং তোমাকে প্রয়োজনীয় ব্যয় অর্থাৎ মিতব্যয়ীর তিরস্কার করা হবে না। সর্বোপরি তুমি তোমার ব্যয় পরিবার-পরিজন হতেই সূচনা কর। আর উপরের হাত নিচে হাতের চেয়েও উত্তম।

বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মত (সা) অপর এক হাদীসে ইরশাদ করেছেন- তোমার সামর্থ্য অনুযায়ী পরিবার-পরিজনের ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা করো।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) হতে বর্ণিত অপর এক হাদীসে রাসূল (সা) ইরশাদ করেন- যে ব্যক্তি ব্যয়ের ব্যাপারে মিতাচার ও সমতার উপরে থাকে সে দরিদ্র ও অভাবগ্রস্ত হয় না।

রাসূল করীম সাল্লাল্লাহু সাল্লাম অন্য আরেক হাদীসে বলেন- ব্যয় করতে গিয়ে মিতব্যায়িতা অবলম্বন করা মানুষের বুদ্ধিমত্তার পরিচয়ক। 

অপর পক্ষে কৃপণতা, সংকীর্ণতা, অপব্যয় ও অপচয়ের ব্যাপারে আল্লাহ তা'য়ালা সর্তকতা অবলম্বন করতে বলেছেন এবং চরম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন।

পবিত্র কুরআনুল কারীমে কৃপণতা ও সংকীর্ণতার শাস্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে- যারা নিজেরা কৃপণতা করে এবং অন্য মানুষকে কৃপণতা করার নির্দেশ দেয় এবং আল্লাহ তায়ালা নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে যে সম্পদ দান করেছেন তা গোপন করে এবং আমি কাফেরদের জন্য অপমানজনক শাস্তি নির্ধারণ করেছে। (সূরা নিসা-৩৭)।

অনুরূপভাবে কোরআনুল কারিমে উদার হস্তে দান করে রিক্ত হস্তে হয়ে যাওয়া ও মিতব্যয়ীতার প্রতি উদাসীন হওয়া থেকে সর্তকতা ও সাবধানতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে। 

আমাদের সমাজে অনেক সময় দেখা যায়, অনেক খ্যাতি লাভের উদ্দেশ্যে উদার হস্তে দান করে নিঃস্ব হয়ে যায়। পরিশেষে পরের দ্বারস্থ হয়। ইসলাম এ ধরনের খ্যাতি ও যশ সংগ্রহের সমর্থন করে না বরং উৎসাহিত করে।

পবিত্র কোরআনে মিতব্যয় ও ব্যয়ের মধ্যপন্থা পরিহার করে অপব্যয় ও অপচয়ের পদ গ্রহণের মাধ্যমে মানবের চিরশত্রু শয়তানের আচরণ গ্রহণ করতে নিষেধ করা হয়েছে।

আল্লাহ তা'য়ালা বলেন- তোমরা অপব্যয় করো না কেননা অপব্যয়কারী শয়তানের ভাই এবং শয়তান তার প্রতিপালকের অবাধ্য। (সূরা ইসরা ২৬-২৭)।

উপরোল্লিখিত আয়াতে অপব্যয় অপচয়কারী শয়তানের ভাই এর সাথে তুলনা করা হয়েছে। কারণ অপব্যয় মানুষকে অনেক অন্যায় কাজে বাধ্য করে। 

পক্ষান্তরে ব্যয়ীতার ফলে মানুষ পরিণামদশী ও পরিকল্পনাধীন জীবন-যাপনে অভ্যস্ত হয়। অপব্যয়ের কারণে মানুষের ভোগের আকাঙ্ক্ষা বৃদ্ধি পায়। চাহিদা পর্যায়ক্রমে সৃষ্টি হয়। ফলে সে অসৎ পথে ও অন্যায় ভাবে অর্থোপার্জনে ব্যতী হয়। এমন কি সুদ-ঘুষ গ্রহণ ও জাতীয় সম্পদ আত্মসাৎ প্রতিবেশী তথা সমাজের দুর্বল শ্রেণীর মানুষের প্রতি জুলুম নির্যাতনের মাধ্যমে সে তার কাঙ্ক্ষিত বস্তু লাভের জন্য ব্যাপৃত হয়। এ সকল অবৈধ এ গর্হিত কাজ করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা বোধ করে না।

বান্দা তার সার্বিক কাজে আল্লাহর আনুগত্য করুক এটাই আল্লাহ তা'য়ালার কাম্য। খাদ্য, পানি পোশাক-পরিচ্ছেদ ব্যবহারিক দ্রব্যদিতে বিলাসিতা বর্জন করে মিতব্যয়ীতা অবলম্বনই আল্লাহর পছন্দনীয়।

তাই মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কুরআনুল কারীমে ঘোষণা করেন- তোমরা অপচয় করো না নিশ্চয় আল্লাহ অপচয়কারীকে পছন্দ করেন। (সূরা আরাফ-৩১)

পরিশেষে আল্লাহপাক আমাদেরকে মিতব্যায়িতা অবলম্বন এবং মনের সংকীর্ণতা অপব্যয় ও অপচয় পরিহার করে সুন্দর জীবন যাপন করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

মুহাদ্দিস আব্দুল গাফফার আল-মাক্কী
প্রধান মুহাদ্দিস (সহকারী অধ্যাপক)
তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসা, প্রধান শাখা।
বিশিষ্ট গবেষক, লেখক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব।


   আরও সংবাদ