ঢাকা, রবিবার, ১৬ মে ২০২১, ২ আশ্বিন ১৪২৮, ৪ শাওয়াল ১৪৪২

জবির অর্থ দপ্তর অর্থ লুটপাটের কারখানা


প্রকাশ: ২৪ এপ্রিল, ২০২১ ০৭:৩৭ পূর্বাহ্ন


জবির অর্থ দপ্তর অর্থ লুটপাটের কারখানা

 

মহিউদ্দিন রিফাতঃ ২০১৮ সালের ২৮ মার্চ অর্থ মন্ত্রনালয়ের এক পরিপত্রে বলা হয়েছে অর্থ বিভাগের ব্যয় নিয়ন্ত্রন অনুবিভাগ কর্তৃক জারিকৃত আর্থিক ক্ষমতা অর্পন সংক্রান্ত নির্দেশনা অনুযায়ী বাজেটে অর্থ সংকুলান সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক মন্ত্রনালয়/বিভাগ/দপ্তরের একজন কর্মচারীকে বছরে বছরে একবার সর্ব্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সম্মানী প্রদান করতে পারবে। কোন কর্মচারীকে ১০ হাজার টাকার অধিক বা একই অর্থ বছরে একবারের অধিক (যে কোন অঙ্ক) সম্মানী প্রদানের ক্ষেত্রে অর্থ বিভাগের সম্মতি বা অনুমোদন গ্রহন করতে হবে।

এছাড়া রুটিন কাজের জন্য কোন সম্মানী প্রদান করা যাবে না বলে পরিপত্রে বলা হয়। কিন্তু জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের শীর্ষকর্তা ও অর্থ বিভাগের কর্মকর্তাগণ সরকারের এ পরিপত্র না মেনে বছরের পর বছর কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয় সান্ধ্যকালীন কোর্সের নীতিমালা অনুযায়ী প্রত্যেকটি বিভাগ কোর্সের ৩৩% অর্থ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে জমা হয়। কিন্তু এই ৩৩% অর্থের ব্যয়ের কোন স্পষ্ট নীতিমালা নেই। এই অস্পষ্টতার সুযোগ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাগন যে যার মত করে ব্যয় দেখিয়ে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক দপ্তর সুত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে শিক্ষকদের আয় করের জন্য বেতন বিবরণী প্রদানের কাজ দেখিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক সেলিম ভূঁইয়া ৭৬,০০০ টাকা, অর্থ ও হিসাব দপ্তরের পরিচালক কাজী নাসির উদ্দিন এক বেসিকের সমপরিমান অর্থ ৫৪,০০০ টাকা, অতিরিক্ত পরিচালক সৈয়দ আহমেদ ৬৮,০০০ টাকা, উপ-পরিচালক হাবিবুর রহমান ৬১,০০০ টাকা,ইব্রাহিম মিয়া ৫১,০০০ টাকা, সহকারী পরিচালক সঞ্জয় কুমার ৩৪,০০০ টাকা,সহকারী পরিচালক তরিকুল ইসলাম ৩৪,০০০ টাকা,সহকারী পরিচালক এছান আহমেদ ৩৪,০০০ টাকা, সহকারী পরিচালক আব্দুল কাদের খান ৩৪,০০০ টাকা, সহকারী পরিচালক (অডিট) আমিনুল ইসলাম ৩৪,০০০ টাকা উত্তোলন করেন।

এছাড়া ২০১৯-২০ প্রথম বর্ষ সম্মান শ্রেণীতে ভর্তির কাজ দেখিয়ে, পরীক্ষার পারিতোষক কাজ দেখিয়ে, ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে ইউজিসিতে বাজেটের প্রস্তাব পাঠানোর কাজ দেখিয়ে আলাদা আলাদা বেসিক সমপরিমাণ অর্থ গ্রহন করেন। অর্থ ও হিসাব দপ্তরের কর্মকর্তাদের অভিযোগ প্রত্যেক বছরই নানান অযুহাতে এ কর্মকর্তাগন অবৈধ সম্মানী গ্রহণ করেন। ২০১৯-২০ অর্থ বছরের জুন মাসে বাজেট করার কাজ দেখিয়ে এ সকল কর্মকর্তাগণ বেসিক পরিমাণ অর্থ নেন। কাজী নাসির উদ্দিন ২০১৯ সালের ২৪ জুন অর্থ ও হিসাব দপ্তরের পরিচালক হিসাবে যোগদান করেন এবং জুন মাসের ২৯ তারিখে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৯-২০ অর্থ বছরের বাজেটের কাজ দেখিয়ে এ পরিচালক ছয় দিনের বিপরীতে এক মাসের সমপরিমাণ বেসিক ৫২,০০০ টাকা নিয়েছেন।

২০১৯ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইভনিং প্রোগ্রামের কাজ দেখিয়ে অর্থ ও হিসাবে দপ্তরের পরিচালক কাজী নাসির উদ্দিন ১,২০,০০০ টাকা, অতিরিক্ত পরিচালক সৈয়দ আহমেদ ১,৩৬,০০০ টাকা, উপ-পরিচালক হাবিবুর রহমান ১,২২,০০০ টাকা, ইব্রাহিম মিয়া ১,০২,০০০ টাকা, সহকারী পরিচালক সঞ্জয় কুমার ৬৮,০০০ টাকা,সহকারী পরিচালক তরিকুল ইসলাম ৬৮,০০০ টাকা,সহকারী পরিচালক এছান আহমেদ ৬৮,০০০ টাকাসহ সংশ্লিষ্টরা আরো টাকা নেন।

এছাড়াও ২০১৯ সালের ৩ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ট্রেজারার অধ্যাপক সেলিম ভূঁইয়া স্বাক্ষরিত উপদেশ পত্র ৫৭-এর থেকে ইভনিং এমবিএ প্রোগ্রাম-জবি সঞ্চয়ী নং ০২০০০০২০৩২৫৫২ হতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমানের ব্যাংক হিসাব নং ০২০০০০১৯৪৩৮৫৯ এ ৭৮,০০০ টাকা, অর্থ ও হিসাব দপ্তরের পরিচালক কাজী নাসির উদ্দিনের ব্যাংক হিসাব নং ৩৪০২৪৮৬৬ এ ৫৪,০৮০ টাকা, উপ-পরিচালক খন্দকার হাবিবুর রহমান এর ব্যাংক হিসাব নং ৩৪০২৩৩৬৩ এ ৬০,৮৪০ টাকা, উপ-পরিচালক ইব্রাহিম মিয়া এর ব্যাংক হিসাব নং ২০০০০১৫৫৪০১৬ এ ৫১,৩০০ টাকা, সহকারী পরিচালক সঞ্জয় কুমার পাল এর  ব্যাংক হিসাব নং ০২০০০০১১৯১০৬০ এ ৩৩,৫৮০ টাকা, সহকারী তরিকুল ইসলামের ব্যাংক হিসাব নং ২০০০০১৪০২২৭৩ এ ৩৩,৫৮০ টাকা, হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মো: ইসরাফিল ব্যাংক হিসাব নং ২০০০০১৬৩২৩৪৩ এ ২৫৪৮০ টাকা নেন।

এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তাগণ ইভনিং এমবিএ এর নীতিমালা অনুযায়ী প্রত্যেক মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিষ্ট্রার ১০,০০০, প্রধান প্রকৌশলী ১০,০০০টাকা, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ১০,০০০টাকা, অতিরিক্ত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ৯,০০০টাকা,অর্থ ও হিসাব দপ্তরের পরিচালক ১০,০০০ টাকা,অতিরিক্ত পরিচালক ৯,০০০ টাকা, উপপরিচালক ৮,০০০ টাকা,সহকারী পরিচালক ৬,০০০ টাকা ,হিসাবরক্ষন কর্মকর্তা ৫,০০০ টাকা পেয়ে থাকেন।

এ বিষয়ে অর্থ ও হিসাব দপ্তরের পরিচালক কাজী নাসির উদ্দিন ও উপ-পরিচালক হাবিবুর রহমানকে মুঠোফোনে একাধিকবার কল দিয়েও পাওয়া যায়নি। উপপরিচালক ইব্রাহিম মিয়া অতিরিক্ত কাজ দেখিয়ে অর্থ গ্রহনের কথা স্বীকার করে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও ট্রেজারার দুইজনেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা তাই তারাও একই আইনে এ অর্থ গ্রহন করেন। তবে অতিরিক্ত সম্মানী গ্রহনে অর্থ মন্ত্রনালয়ের পরিপত্র ভঙ্গ করা হচ্ছে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন এ বিষয়টি আমাকে কাগজ দেখে বলতে হবে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ট্রেজারার ও ব্যবসায় অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক ড. শওকত জাহাঙ্গীর বলেন,  বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিরিক্ত কাজ দেখিয়ে শুধু বাজেট প্রণয়নের সময় একটি বেসিক গ্রহনের সুযোগ আছে। বিভিন্নখাতের কাজ উল্লেখ করে একাধিকবার বেসিক সমপরিমাণ সম্মানী গ্রহণ করা অনুচিত। আমাদের ইভনিং এমবিএ সম্মানী গ্রহনের যে নীতিমালা প্রণীত হয়েছিল তাতে অনেক অস্পষ্টতা আছে। এ নীতিমালা প্রণয়নের সময় ডিনদের রাখা হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের শীর্ষকর্তারা নীতিমালা প্রণয়ন করেছেন। এ নীতিমালায় কতজন কর্মকর্তা,কর্মচারী কারা করা কত সম্মানী পাবেন তা স্পষ্ট নয়। এই স্পষ্টতার সুযোগ নিয়ে অনেকে বেশি অর্থ গ্রহণ করেন।

তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একাডেমিক অটোনেমি থাকলেও ফাইনান্সিয়াল অটোনমি নেই। এ বিষয়টিতে আমরা সবসময় ভুল করি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বায়ত্বশাসিত সংস্থা হওয়ায় আমরা অনেক সময় নিজেদের মত করে ব্যখ্যা দেই।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সভাপতি নূরে আলম আব্দুল্লাহ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ ও হিসাব দপ্তরের ভাষ্য অনুযায়ী বছরে একটির বেশি বেসিক পরিমাণ সম্মানী গ্রহনের সুযোগ নেই।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্বে থাকা ট্রেজারার অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিন বলেন, সরকার ও ইউজিসির দুইটি অডিট টিমের মাধ্যমে অর্থ হিসাব দপ্তরের সম্মানীর হিসাবগুলো নিষ্পত্তি করা হয়। এরপরেও যদি সেখানে কোন ধরনের অসঙ্গতি থাকে তাহলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।


   আরও সংবাদ