ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৩ এপ্রিল ২০২১, ৩০ শ্রাবণ ১৪২৭, ১ রমজান ১৪৪২

বঙ্গবন্ধু বাংলা ভাষাকে দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে ঘোষণা করেন


প্রকাশ: ২২ ফেব্রুয়ারী, ২০২১ ১১:১৮ পূর্বাহ্ন


বঙ্গবন্ধু বাংলা ভাষাকে দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে ঘোষণা করেন

কূটনৈতিক প্রতিবেদক : অমর একুশে ফেব্রুয়ারিকে ২০২২ সাল থেকে ‘গ্রেটার লন্ডন মাল্টিলিংগুয়ালিজম এ্যান্ড ডাইভারসিটি'ডে’ পালনের প্রস্তাব উত্থাপনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ হাই কমিশন ‘মুজিববর্ষ বাংলা ভাষা শহিদ দিবস’ ও ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ যথাযোগ্য মর্যাদায় এক বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পালন করেছে। 

এ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে বিশিষ্ট ব্রিটিশ এমপি, লন্ডনে অবস্থিত বিভিন্ন দূতাবাসের কূটনীতিকগণ এবং ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কমিউনিটির নেতৃস্থানীয় প্রতিনিধিরা অংশ নিয়ে বায়ান্নোর মহান ভাষা শহিদের ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

বাংলাদেশ হাই কমিশন, লন্ডন ও যুক্তরাজ্য ইউনেস্কো কমিশনের যৌথ উদ্যোগে বঙ্গবন্ধু‘র জন্মশতবার্ষিকীর এই বিশেষ অনুষ্ঠানে লন্ডনে অবস্থিত ১৩টি দূতাবাসের হাইকমিশনার ও রাষ্ট্রদূতগণ অংশ নেন ও দূতাবাসগুলোর প্রতিনিধিত্বকারী শিল্পীরা মহান ভাষা শহীদ ও বঙ্গবন্ধুকে উৎসর্গ করে মনোজ্ঞ সঙ্গীত, আবৃত্তি ও নৃত্য এবং নিউহ্যামের সঙ্গীত বিভাগের শতাধিক শিশু-কিশোর শিল্পী সমবেত কন্ঠে “আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি” অমর সঙ্গীতটি পরিবেশন করে। 

দূতাবাসগুলোর মধ্যে ছিলো সাইপ্রাস, ভারত, মালদ্বীপ, সেন্ট ক্রিস্টোফার ও নেভিস, শ্রীলংকা, জর্জিয়া, হনডুরাস, মলডোভা, সার্বিয়া, উত্তর ম্যাসিডোনিয়া, রাশিয়া ও থাইল্যান্ড।

যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত হাইকমিশনার সাইদা মুনা তাসনীমের সভাপতিত্বে এ ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি, মিনিস্টার ফর লন্ডন, স্মল বিসনেজ এন্ড এন্টারপ্রাইজ পল স্কালি এমপি, কমনওয়েলথ সেক্রেটারি জেনারেল প্যাট্রিসিয়া স্কটল্যান্ড কিউসি, ইউনেস্কোর প্রাক্তন মহাপরিচালক মিসেস ইরিনা বোকোভা, ভারতের হাইকমিশনার মিসেস গায়ত্রি ইসার কাউর, থাইল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত পিসানু সুভানাজাতা, ইউকে ন্যাশনাল কমিশন ফর ইউনেস্কো-এর চিফ এক্সিকিউটিভ জেমস ব্রিজ, বাংলাদেশি-ব্রিটিশ এমপি আপসানা বেগম, যুক্তরাজ্যের ফরেন, কমনওয়েলথ এ্যান্ড ডেভলপমেন্ট অফিসের (এফসিডিও) দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের পরিচালক বেন মেলর, ব্রিটিশ কাউন্সিল গ্লোবাল নেটওয়ার্কেও পরিচালক চার্লি ওয়াকার, যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক সুলতান মাহমুদ শরীফ এবং ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কমিউনিটির প্রতিনিধি সৈয়দ সাজিদুর রহমান ফারুক।

শিক্ষামন্ত্রী ডা.দীপু মনি বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর অসামান্য নেতৃত্বের কথা উল্লেখ করে বলেন, “বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশে বাংলা ভাষাকে দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে ঘোষণা করেন এবং পরবর্তীতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে সর্বপ্রথম বাংলায় ভাষণ দিয়ে বাংলা ভাষাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করেছেন। 

বঙ্গবন্ধুকে অনুসরণ করে তাঁরই সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৯ সালে বিশেষ কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করে একুশে ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা দিবসকে ইউনেস্কো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছেন। 

যার ফলে আজ সমগ্র বিশ্বব্যাপী অমর একুশকে নিজ নিজ মাতৃভাষার দিবস হিসেবে উদযাপন করছেন।” তিনি একুশে ফেব্রুয়ারিকে ২০২২ সাল থেকে গ্রেটার লন্ডন ভাষা ও বৈচিত্র্য দিবস’ হিসেবে ঘোষনার আহবান জানিয়ে বলেন ২০২২ সালে বাংলাদেশে অমর একুশের এবং ব্রিটিশ কাউন্সিলের ৭০ বছর পূর্তি উদযাপন করা হবে।

হাইকমিশনার সাইদা মুনা তাসনীম ভাষা শহীদ ও বঙ্গবন্ধুর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, “বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও বাঙালি জাতীয়তার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সমস্ত দলীয় ছাত্র ভাষা অ্যাকশন কমিটি-র প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন এবং ১৯৫৩ সালে পুরনো ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে একুশে ফেব্রুয়ারিকে ভাষা শহীদ দিবস হিসেবে পালনের ঘোষণা দিয়েছিলেন।

তাঁরই সুযোগ্য কণ্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলা ভাষার মর্যাদা, সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করছেন। প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগেই একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা পেয়েছে। তিনি বাংলা ভাষাকে জাতিসংঘের অন্যতম দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে অন্তর্ভূক্তির জন্যও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ ও প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন।

তাঁরই বিশেষ উদ্যোগে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বিশ্বের একমাত্র আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইন্সিটিটিউট। এখানে বিশ্বের বিলুপ্ত প্রায় ছয় হাজার মাতৃভাষা সংরক্ষণের গবেষণা হচ্ছে। একইভাবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পাঁচটি পার্বত্য নৃগোষ্ঠির মাতৃভাষা প্রাথমিক শিক্ষা পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভূক্ত করার মাধ্যমে নৃগোষ্ঠির মাতৃভাষা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছেন।

হাইকমিশনার যুক্তরাজ্যে ‘বাংলা ল্যাংগুয়েজ ও ক্যালচারার স্কুলগুলো’ পুনরায় চালু করার জন্য যুক্তরাজ্য সরকারের প্রতি আহবান জানান যাতে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি তরুণ প্রজন্ম নিজেদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য চর্চা অব্যাহত রাখতে পারে।

মিনিস্টার ফর লন্ডন পল স্কালি ভাষা শহীদ এবং বঙ্গবন্ধু‘র প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, যুক্তরাজ্যে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কমিউনিটি অমর একুশের মহান আদর্শ ধারণ করে আছে যা আগামী দিনগুলোতেও এদেশে নিজ নিজ মাতৃভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ ও উন্নয়নে শুধু বাংলা ভাষাভাষি নয় অন্য ভাষার মানুষকেও উৎসাহ যোগাবে।

কমনওয়েলথের সেক্রেটারি জেনারেল পেট্রিসিয়া স্কটল্যান্ড বায়ান্নোর ভাষা শহিদ ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রতিটি দেশে শিক্ষা সংস্কৃতি ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে মাতৃভাষার সংরক্ষণ ও চর্চার ওপর বিশেষ গুরুতারোপ করেন।

ইউনেস্কোর সাবেক মহাপরিচালক মিস ইরিনা বোকোভা ২০০৭ সালে তার সময়ে বঙ্গবন্ধু‘র ঐতিহাসিক ৭মার্চ-এর ভাষনকে ইউনেস্কোর মানবতার স্মরণে বিশ্ব-রেজিস্টার জি ডকুমেন্টারিঐতিহ্য হিসেবে অন্তর্ভূক্ত করার কথা স্মরণ করে বলেন, এই ঐতিহাসিক ভাষণ ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছেও স্বাধিকার ও মুক্তি অর্জনের ক্ষেত্রে অপরিসীম অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। 

তিনি গত ডিসেম্বরে ইউনেস্কো ঘোষিত ‘‘সৃজনশীল অর্থনীতির জন্য ইউনেস্কো-বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আন্তর্জাতিক পুরস্কার’’-এর কথা উল্লেখ করে বলেন, এই এ্যাওয়ার্ড প্রদানের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী বঙ্গবন্ধু‘র আদর্শ প্রচারিত হবে যা যুব সমাজকে সৃজনশীল অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে গবেষণায় উৎসাহিত করবে।

ভারতের হাইকমিশনার মিসেস গায়ত্রি ইসার কাউর বলেন, “বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলনেরও নেতৃত্বে ছিলেন এবং তিনি ভবিষ্যতেও বাংলাদেশের অব্যাহত উন্নয়ন অগ্রগতির প্রেরণা হয়ে থাকবেন।” 

সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের অসামান্য আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্ব, প্রগতিশীল নীতিমালা এবং দৃঢ় অঙ্গিকারের প্রশংসা করে তিনি বলেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ জীবন মানের উন্নয়ন, প্রাকৃতিক দূর্যোগ মোকাবেলায় সক্ষমতা অর্জন এবং এসডিজি বাস্তাবায়নের ক্ষেত্রে বিশ্বে রোল মডেলের মর্যাদা অর্জন করেছে।

ইউকে ন্যাশনাল কমিশন ফর ইউনেস্কো-এর চিফ এক্সিকিউটিভ জেমস ব্রিজ বলেন ইউনেস্কো ২০২১ সালের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস “শিক্ষা ও সমাজে অন্তর্ভুক্তির জন্য বহুভাষিকতাকে উত্সাহিত করা” থীমের ওপর পালন করছে। যার লক্ষ্য হচ্ছে ভাষা ও সংস্কৃতির বহুমাতৃকতা প্রচার ও প্রসারের মাধ্যমে সব দেশ ও জাতির স্থিতিশীল উন্নয়ন সুনিশ্চিত করা।

অনুষ্ঠানের শুরুতে হাইকমিশনার হাই কমিশনের কর্মকর্তাদের নিয়ে সামাজিক দূরত্ব মেনে অনুষ্ঠানস্থলে স্থাপিত একটি প্রতীকী শহীদ মিনারে পুষপার্ঘ্য অর্পণ করেন। এরপর ভাষা শহীদ ও অন্যান্য শহিদদের স্মরণে এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়।


   আরও সংবাদ