ঢাকা, রবিবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০২০, ২১ চৈত্র ১৪২৭, ২০ রবিউল সানি ১৪৪২

সাংবাদিকতায় করোনা কালীন প্রতিবন্ধকতা


প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর, ২০২০ ০৯:১৪ পূর্বাহ্ন


সাংবাদিকতায় করোনা কালীন প্রতিবন্ধকতা

আবদুল্লাহ আল লোফাজ : বর্তমানে সারা বিশ্ব করোনা ভাইরাসের কারনে স্থবির হয়ে পড়েছে। সাধারণ মানুষ মানবেতর জীবন যাপন করছেন। পেশা হারাচ্ছেন বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ। করোনা পরিস্থিতিতে একজন সাংবাদিক তার পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কি কি সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন  তা জানতে অদম্য বাংলার রিপোর্টার কথা বলেছেন দৈনিক কালের কন্ঠের খুলনা প্রতিনিধি কৌশিক দের সাথে।

প্রশ্নঃ করোনা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে কিভাবে আপনি আপনার পেশাদারী দায়িত্ব পালন করে চলেছেন? এবং  এক্ষেত্রে কি কি প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে?

কৌশিক দেঃ সর্বপ্রথম চিনে করোনা ভাইরাস সনাক্ত হলে তেমন কোন আতঙ্ক কাজ করেনি।মনে হয়েছিল বাংলাদেশের মানুষের ইমুইনিটি সিস্টেম ভালো;করোনা ভাইরাস আক্রমণ করলে ও তেমন কিছু হবেনা। পরবর্তীতে  বাংলাদেশে যখন করোনা ভাইরাস আক্রমণ করলো তখন সত্যিই আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে পড়ি।সারা দেশ লকডাউন করে দেওয়া হলো।মানুষ ঘরবন্দী জীবন যাপন করতে লাগলো।কিন্ত যেহেতু আমি একজন সাংবাদিক তাই আমি আর ঘরে বসে থাকতে পারিনি। আমাকে বেড়িয়ে পড়তে হয়েছে সংবাদ সংগ্রহ করাতে। 

জীবনের ঝুকি নিয়ে এখনও সংবাদ সংগ্রহ করে যাচ্ছি।তবে আমি প্রথম থেকেই মাস্ক,হ্যান্ড সেনিটাইজার, গ্লোবস ব্যাবহার করছি।যদিও সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা উচিৎ কিন্ত সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে মাঝে মধ্যে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা সম্ভব হয়না। বিভিন্ন সময়ে বিশেষজ্ঞ কিংবা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের  মতামত,পরামর্শ নেওয়ার জন্য সাক্ষাৎকারের প্রয়োজন পরে কিন্ত করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের ভয়ে তারা ফেস টু ফেস সাক্ষাৎকার দিতে রাজি হতে চান না। এক্ষেত্রে আমাদেরকে ওভার ফোনে সাক্ষাৎকার গ্রহন করতে হয়। যার ফলে আমরা প্রাপ্ত তথ্য সঠিকভাবে যাচাই করতে পারি না।

প্রশ্নঃ করোনাকালে নিজেকে সুরক্ষিত রেখে দায়িত্ব পালন করা সব থেকে বড় চ্যালেঞ্জ। নিজেকে সুরক্ষিত রেখে কিভাবে আপনি আপনার দায়িত্ব পালন করে চলেছেন? এক্ষেত্রে আপনার পত্রিকা হাউস কি কোন সুরক্ষা সরঞ্জাম প্রদান করছে?

কৌশিক দেঃ পত্রিকা হাউস কোনো ধরনের সুরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ না করলেও সার্বক্ষণিক দিক নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছে।প্রয়োজনে যে সকল যায়গা ঝুকিপূর্ণ সে সকল যায়গায় না গিয়ে সোর্স কিংবা মোবাইলের মাধ্যমে সঠিক তথ্য সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে। করোনা রোগীর সংস্পর্শে না যাওয়া এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে সংবাদ সংগ্রহ করার জন্য আমাদেরকে বারবার বলা হচ্ছে। 

আমি নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে মাস্ক,সেনিটাইজার,হ্যান্ড গ্লোভস ব্যাবহার করছি। যতটুকু সম্ভব সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করছি।নিজেকে সুস্থ রাখতে বাইরের পানি, টং দোকানের চা ইত্যাদি পরিহার করে চলছি। এবং বাসায় গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সাথে দেখা করার পূর্বে ওয়াশরুমে গিয়ে পরিহিত জামা কাপড় নিজেই জীবাণু মুক্ত করি।এভাবে আমি নিজেকে সুরক্ষিত রেখে কাজ করে যাচ্ছি।

প্রশ্নঃ আমরা দেখতে পাচ্ছি যে করোনা মহামারীর কারণে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছে।যার ফলে তারা কর্মীদের বেতন কমিয়ে দিচ্ছেন এমনকি কোন কোন প্রতিষ্ঠান কর্মী ছাঁটাইয়ের মত ন্যাক্কারজনক কাজ ও করছে। এক্ষেত্রে আপনি কিংবা আপনার সহকর্মীরা এরকম কোন সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন কিনা? 

কৌশিক দেঃ জ্বি,অবশ্যই সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি। আমি একজন স্টাফ রিপোর্টার ; ওয়েজবোর্ডের অষ্টম গ্রেড অনুযায়ী বেতন পেতাম। বর্তমানে অর্ধেক বেতন পাচ্ছি। যা দিয়ে ফ্যামিলি নিয়ে চলা আমার জন্য কষ্ট সাধ্য হয়ে পড়েছে। পত্রিকা হাউস কোন ধরনের নোটিস ছাড়া বেতন অর্ধেক কমিয়ে দিয়েছে। সবথেকে বড় সমস্যা হচ্ছে, সারাক্ষণ চাকুরী হারানোর ভয় কাজ করছে। 

আপনারা হয়তো জেনে থকবেন যে আমাদের অফিসের অনেক কে চাকুরী থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। যখন শুনি কাউকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে তখনই চাকুরী  হারানোর ভয়ে আতঙ্কিত হই।এই মহামারীর মধ্যে চাকরি চলে গেলে কিভাবে পরিবার নিয়ে বেচে থাকবো বুঝতে প্পারছিনা। আমি পরিবারের  একমাত্র উপার্জনকারী।এই মুহূর্তে চাকরিটা চলে গেলে না খেয়ে থাকা ছাড়া কোন উপায় থাকবেনা। সবমিলিয়ে খুবই আতঙ্কের মধ্য দিয়ে দিন পার করছি।

প্রশ্নঃ পেশাদারী দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আপনি বা আপনার সহকর্মী কেউ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন? যদি আক্রান্ত হয়ে থাকেন তাহলে পরবর্তীতে কিভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

কৌশিক দেঃ সৃষ্টিকর্তার অশেষ কৃপায় আমি কিংবা আমার খুলনা অফিসের কেউ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়নি। তবে আমাদের ঢাকা অফিসের অনেকেই করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। সহকর্মীদের আক্রান্তের খবর আমাদেরকে যদিও আতঙ্কিত করেছে তবুও আমরা কখনোই আমাদের দায়িত্বে অবহেলা করিনি। যখন জানতে পেরেছি আমাদের অফিসের  কেউ আক্রান্ত হয়েছি তখন আমরা বেশি করে সেফটি নিয়ে চলেছি কারণ যেকোন সময় আমরা ও আক্রান্ত হতে পারি।

প্রশ্নঃ করোনাকালে সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা ত্রান-সাহায্য প্রদান করছে। ত্রান সামগ্রী বন্টনে আমরা বিভিন্ন সময়ে অনিয়ম দূর্নীতি দেখতে পেয়েছি। এসকল অনিয়ম,দূর্নীতির বিরুদ্ধে সংবাদ প্রচার করতে গিয়ে কোন ধরনের হুমকির মুখে পড়তে হয়েছে কি? 

কৌশিক দেঃ আপনি জেনে থাকবেন যে  ত্রান-সাহায্য আসে গরীব, দুঃখী, অসহায় মানুষদের জন্য। আর সেই ত্রান সামগ্রী যখন একটি মহল সঠিকভাবে বন্টন না করে নিজেদের পকেট ভারি করে তখন একজন সাংবাদিক হিসাবে তার বিরুদ্ধে কলম তুলে নেওয়া আমার দায়িত্ব। কিন্ত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নানা ধরনের হুমকির মুখে পড়তে হচ্ছে। বিভিন্ন পর্যায় থেকে সংবাদ প্রকাশ করতে নিষেধ করা হচ্ছে যা খুবই দুঃখজনক।আমি মনেকরি জনগণের ভোটে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হলে এমনটি ঘটতে পারতোনা।

প্রশ্নঃ করোনাকালে বেশিরভাগ সাংবাদিকদের ঠিকমতো বেতন-ভাতা প্রদান করা হচ্ছেনা। জীবন পরিচালনা করতে তাদেরকে হিমসিম খেতে হচ্ছে। এমন অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য কোন সাংবাদিক সংগঠন কিংবা সরকারি তহবিল থেকে কোন ধরনের সহায়তা পেয়েছেন?

কৌশিক দেঃ দুঃখজনক হলেও সত্য যে কোন ধরনের সংগঠন থেকে কোন প্রকার সাহায্য সহযোগিতা পাইনি। তবে খুলনায় সরকারের একটি তহবিল থেকে প্রতিজন সাংবাদিককে ১০,০০০ টাকা করে প্রদান করা হয়।এক্ষেত্রে কিছু শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছিল যেমন,কেবলমাত্র তারাই সাহায্য গ্রহণ করতে পারবে যারা ওয়েজবোর্ড অনুযায়ী বেতন পায়না, ৮০০০ কিংবা তার  থেকে কম টাকা বেতন পান কিংবা করোনাকালে যেসকল সাংবাদিকেরা চাকুরী হারিয়েছেন। কোন শর্ত পূরণ করতে না পারায় আমি সরকারি তহবিলের সাহায্য ও গ্রহণ করতে পারিনি।

প্রশ্নঃ মৃত্যু ঝুকি আছে যেনেও সাংবাদিকতা করে যাচ্ছেন। এক্ষেত্রে কোন বিষয়টাকে মুখ্য করে দেখছেন? ১.পেশাদারিত্ব ২.সামাজিক দায়বদ্ধতা। 

কৌশিক দেঃ প্রথমত এটা আমার পেশাদারি দায়িত্ব। তবে অবশ্যই সামাজিক দায়বদ্ধতাও  রয়েছে। আপনি লক্ষ করে থাকবেন যে করোনাকালে অনেক ডাক্তার মৃত্যু ভয়ে চাকুরী থেকে অব্যাহতি নিয়েছেন কিন্ত একজন সংবাদকর্মী ও কিন্ত সেচ্ছায় চাকুরী থেকে অব্যাহতি নেননি।কেননা সমাজের সঠিক চিত্রকে মানুষের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে আমাদের দায়িত্ব সেটা যতই প্রতিকুল অবস্থার মধ্যে হোক না কেন। 

আমরা সাধারণ মানুষ কে করোনা ভাইরাসে শঙ্কিত না হয়ে তাদেরকে সচেতন করতে কাজ করে যাচ্ছি। করোনায় আক্রান্ত কিংবা সন্দেহ হলে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে বলছি। বিভিন্নভাবে আমরা এই প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও  সাধারণত মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করছি।


   আরও সংবাদ