ঢাকা, রবিবার, ১৬ মে ২০২১, ২ আশ্বিন ১৪২৮, ৪ শাওয়াল ১৪৪২

মে দিবস ও অবহেলিত ভেটেরিনারি পেশা


প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল, ২০২১ ১১:৩৫ পূর্বাহ্ন


মে দিবস ও অবহেলিত ভেটেরিনারি পেশা

আজ পহেলা মে! শ্রমিকদের সম্মানার্থে আন্তর্জাতিকভাবে পালিত হয় মে দিবস। দেশে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই অনেক শ্রমিকের। শুধুমাত্র নিজ পেশা ও পেশার মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও সম্মানবোধ দিয়েই তারা সব বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ। প্রয়োজনবোধে রাজপথে নেমে হলেও নিজেদের অধিকার আদায়ে বদ্ধপরিকর তারা। 

অথচ ভেটেরিনারিয়ানরা দেশের উচ্চশিক্ষিত জনগোষ্ঠী হয়েও ৬০ বছরে প্রাণিসম্পদ সেক্টরের খুব একটা পরিবর্তন আনতে পারেনি। অবহেলিত এই সেক্টরের সাথে মে দিবসের যোগসূত্র খুঁজেছেন গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি এন্ড এনিমেল সায়েন্সেস অনুষদের দুজন শিক্ষক প্রভাষক ডা.ফারহানা নাজনীন মিতু ও ডা. শফিউল্লাহ পারভেজ। লিখেছেন বিএন নিউজের ক্যাম্পাস প্রতিনিধি বরাতুজ্জামান স্পন্দন।

বাংলাদেশের সৃষ্টিলগ্ন থেকে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে এসে দেশের মোট জনসংখ্যা দ্বিগুনের চেয়ে বেশী বেড়েছে। আবাদি জমির পরিমাণ কমেছে। তারপরও এই দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্যের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। 

দেশের ক্রমবর্ধমান মানুষের পুষ্টি চাহিদা পূরণে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরসহ সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে কর্মরত ভেটেরিনারিয়ানদের অবদান অনস্বীকার্য। দেশের প্রাণিজ আমিষের প্রায় ৮০ শতাংশ পুরণ হয় ডিম, দুধ ও মাংস থেকে। যার ৪৫ শতাংশ আসে পোল্ট্রি থেকে। দেশে ২০০০ সালের তুলনায় ২০১৬ সালে ডিমের ভোগ বেড়েছে প্রায় ১৬০ শতাংশ, মাংসের ৮৫ শতাংশ। 

বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০৩০ সালে বাংলাদেশে ডিমের ভোগ বাড়বে আরো ৭১ শতাংশ এবং মাংসের ৬৫ শতাংশ। যেহেতু মানুষের ১৫০০ ধরনের সংক্রমণ রোগের প্রায় ৬০% জুনোটিক রোগ এবং ৭৫% ইমার্জিং সংক্রামক রোগ প্রাণী থেকেই মানুষে আসছে, তাই এসব রোগ থেকে বাচতে নিরাপদ প্রাণিজ আমিষের কোনো বিকল্প নেই।

মানুষের প্রায় ২৫০ টা খাদ্যজনিত রোগ এ পর্যন্ত রেকর্ড করা হয়েছে, যার প্রায় সবগুলোই প্রাণী থেকে আসে। শুধুমাত্র যক্ষায় আক্রান্ত হয়ে ২০১৮ সালে বিশ্বে ১২৩০০ মানুষ মারা গেছে এবং দক্ষিণ এশিয়ায় ৪৪৮০০ আক্রান্ত হয়ে ২০৯০ জন মারা গেছে। জলাতঙ্ক আক্রান্ত হয়ে বিশ্বে প্রতিবছর ৬০০০০ মানুষ মারা যায়। ভারত এবং চীনের পরে বাংলাদেশ ৩য় জলাতঙ্ক আক্রান্ত দেশ। এ দেশে প্রতিবছর ২১০০ মানুষ মারা যায় জলাতঙ্ক রোগে।

এছাড়াও এন্টিবায়োটিক রেজিস্টেন্স বর্তমান বিশ্বে একটি অন্যতম সমস্যা। যার সাথে প্রাণী চিকিৎসা এবং প্রাণিজ খাদ্যের সম্পর্ক গভীর থেকে গভীরতম। এরকম আরও অনেক সমস্যা রয়েছে যেগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে হলে ভেটেরিনারি সেক্টরে আরও তদারকি বৃদ্ধি আবশ্যক। সেজন্য এ সেক্টরে কাজের পরিধি এবং অনেক জনবল বাড়াতে হবে। মাঠ পর্যায়ে ভেটেরিনারিনারিয়ানের সংখ্যা বাড়ানোর সাথে সাথে, মেডিকেল ভেটেরিনারি কোলাবরেশন করে ওয়ান হেলথ কন্সেপ্টে কাজ করতে হবে।

ভেটেরিনারি সেক্টরকে অবহেলা করে মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষার কোনো সুযোগ নেই। একটি উপজেলায় যেখানে কমপক্ষে ৪-৫ জন ভেটেরিনারি ডাক্তার থাকা উচিত, আমাদের আছে মাত্র একজন। উপজেলা পর্যায়ে কোনো ভেটেরিনারি পাবলিক হেলথ অফিসার নেই। সকল উন্নত দেশ এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ভেটেরিনারি সেবাকে জরুরী সেবার আওতাভুক্ত করা হলেও বাংলাদেশে এখনো ভেটেরিনারি সেবা জরুরী সেবার আওতাভুক্ত হয়নি। দ্রুত এসব বিষয় বিবেচনা করে সরকার এবং সংশ্লিষ্টদের যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।

ডা. শফিউল্লাহ পারভেজ প্রভাষক, ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমাল সায়েন্সেস অনুষদ।

পহেলা মে শ্রমিকদের সম্মানার্থে আন্তর্জাতিকভাবে মে দিবস পালিত হয়। তবে অনেক শ্রমিকেরই নেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা সুশৃঙ্খল নীতিমালা। কিন্তু তাদের মধ্যে নিজ পেশা ও পেশার মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও সম্মানবোধ রয়েছে। এটা তাদেরকে যেকোনো বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ রাখা ও অধিকার আদায়ে সহায়ক হিসেবে কাজ করে। 

আমরা ভেটেরিনারিয়ানরাও দেশের প্রাণিসম্পদের সার্বিক উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে দীর্ঘদিন শ্রম দিয়ে যাচ্ছি। পরিতাপের বিষয়, দেশের উচ্চশিক্ষিত ও সুশৃঙ্খল জনগোষ্ঠী হয়ে ৬০ বছরেও এই সেক্টরে আশানুরূপ পরিবর্তন করতে পারিনি। শ্রমিকদের যেখানে বহু নাম ও আদর্শধারী সক্রিয় সংগঠন রয়েছে সেখানে ভেটেরিনারিয়ানদের রয়েছে  হাতেগোণা কয়েকটা সংগঠন। 

কিছু সংগঠনের হয়তো আছে স্বদিচ্ছার অভাব আবার কিছু সংগঠন স্বপ্রণোদিত হয়ে কাজ করতে চাইলেও নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হচ্ছে। সরকারিভাবে প্রত্যেক উপজেলায় মাত্র দুইজন ভেটেরিনারিয়ান নিয়োগ দেওয়া হয় যা বর্তমান বর্ধিত প্রাণিসম্পদের তুলনায় অপর্যাপ্ত। সুতরাং আমরা সেবা দিতে চাইলেও পেরে উঠছি না। 

তাছাড়া এ সেক্টরে রয়েছে নানাবিধ বিভাজন। যার কারণে তৈরি হচ্ছে মতানৈক্য। ভেটেরিনারিয়ানরা হারাচ্ছে ঐক্য , নিজ পেশা ও পেশার মানুষের প্রতি জন্মাচ্ছে সম্পর্ক শূন্যতাসূচক মনোভাব। ফলে সরকার কর্তৃক যে সকল সুযোগ-সুবিধা খুব স্বাভাবিকভাবেই পাওয়ার কথা, তা পেতে আন্দোলন করতে হচ্ছে। ঐক্যবদ্ধ না থাকায় আন্দোলনও বেগবান হচ্ছে না।

সর্বোপরি, যেকোনো অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে ঐক্যবদ্ধ থাকার কোনো বিকল্প নাই তা উপলব্ধি করতে হবে আমাদের। পেশা যেটাই হোক, অধিকার আদায়ে একতা, পেশা ও পেশার মানুষের প্রতি ভালোবাসার বিকল্প নাই।

লেখক: ডা.ফারহানা নাজনীন মিতু প্রভাষক ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্সেস অনুষদ।


   আরও সংবাদ