ঢাকা, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২০, ৮ ফাল্গুন ১৪২৭, ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

চৌগাছায় ৩ জনের ডিলারশিপ বাতিলের সিদ্ধান্ত আগামীকাল, নিরাপত্তাহীনতায় কৃষি কর্মকর্তা


প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর, ২০২০ ০৮:০৬ পূর্বাহ্ন


চৌগাছায় ৩ জনের ডিলারশিপ বাতিলের সিদ্ধান্ত আগামীকাল, নিরাপত্তাহীনতায় কৃষি কর্মকর্তা

   

যশোর প্র‌তি‌নি‌ধি : যশোরের চৌগাছার তিন বিসিআইসি সার ডিলারের ডিলারশিপ বাতিলের বিষয়ে আগামীকাল জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত হবে বলে জানা গেছে।

আগামীকাল রোববার (১৮ অক্টোবর) দুপুর ১টায় যশোর জেলা প্রশাসনের সভাকক্ষে জেলা প্রশাসক তমিজ উদ্দিনের সভাপতিত্বে এই সভা অনুষ্ঠিত হবে বলে এক বার্তায় জানানো হয়।

গত ১৪ অক্টোবর বুধবার চৌগাছা উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভায় সার উত্তলোন ও বিক্রয়ের সরকারি নীতিমালা ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে অপরাধের ধারা অব্যহত রাখায় উপজেলার তিন বিসিআইসি ডিলারের ডিলারশিপ বাতিলের সিদ্ধান্ত রেজুলেশন আকারে জেলা কমিটিতে পাঠানো হয়। 

এদিকে এই রেজুলেশন জেলা কমিটিতে পাঠানোর পর থেকেই উপজেলা কৃষি অফিসারকে নানাভাবে থ্রেট করা হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেছেন। এতে তিনি নিরাপত্তাহীনতা বোধ করছেন বলেও তিনি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন।

অভিযুক্ত তিন ডিলার হলেন নারায়নপুর ইউনিয়নের বিসিআইসি সার ডিলার ও উপজেলা ফার্টিলাইজারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এবং উপজেলা বিএনপির ১নং যুগ্ম আহবায়ক ইউনূচ আলীর মালিকানাধীন মেসার্স ইউনূচ আলী, পাতিবিলা ইউনিয়নের বিসিআইসি সার ডিলার মোঃ ফরিদুল ইসলামের মালিকানাধীন মেসার্স ফরিদুল ইসলাম এবং পৌরসভার বিসিআইসি সার ডিলার মোঃ আতিকুর রহমান লেন্টুর মালিকানাধীন মেসার্স শয়ন ট্রেডার্স।

১৪ অক্টোবরের সভায় উপজেলা কৃষি অফিসার চৌগাছার সার মনিটরিংয়ের উপর আলোচনাকালে জানান তিনি ২০১৭ সালে চৌগাছায় যোগদান করেই উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সভাপতিত্বে সভায় ডিলারদের নীতিমালা মেনে সার বিক্রির নির্দেশনা দেন। এরপর কৃষি মন্ত্রণালয়ের গত ১২ আগস্ট তারিখের ১০৯ নং স্মারকপত্রে নির্দেশের আলোকে সারের চলমান মনিটরিং কার্যক্রমকে আরো জোরদার করা হয়। 

ওই পত্রের আলোকে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের স্ব স্ব ইউনিয়নে অবস্থিত বিসিআইসি সার ডিলারদের সার উত্তোলন, মজুদ ও সরকার নির্ধারিত মূল্যে রাসায়ণিক সার বিক্রয়ের তদারকি জোরদার করার জন্য ১৮ আগস্ট ৪২১ নং স্মারকপত্রের মাধ্যমে নির্দেশ প্রদান করা হয়।

তাদের তথ্যের ভিত্তিতে উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও উপজেলা কৃষি অফিসার ২০ আগস্ট মেসার্স শয়ন ট্রেডার্সের গুদাম পরিদর্শনকালে দেখতে পান তিনি আগমনি বার্তা প্রদানকৃত ১৭ মে.টন ডিএপি সার গুদামে উত্তোলন করেন নি এবং প্রতীয়মান হয় তিনি ওই সার বাইরে বিক্রি করে দিয়েছেন। সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা ২০০৯ এর ১২.৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি ও সদস্য সচিব (উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও উপজেলা কৃষি অফিসার) মেসার্স শয়ন ট্রেডার্সের সার বিক্রি বন্ধের আদেশ দেন এবং কৈফিয়ত তলব করেন। কিন্তু মেসার্স শয়ন ট্রেডার্স সার বিক্রি অব্যাহত রেখে কর্তৃপক্ষের আদেশ অমান্য করেন। পরবর্তীতে কর্তৃপক্ষের নিয়ম মেনে সার বিক্রি করবেন বলে কৈফিয়ত তলবের জবাব দেন। 

এর ধারাবাহিকতায় ২৬ আগস্ট সমস্ত সার ডিলারডের নিয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মহোদয়ের সভাপতিত্বে এক মিটিংয়ে সমস্ত ডিলারদের নিয়মানুযায়ী ব্যবসা পরিচালনার তাগিদ দেয়া হয়। তারপরও কিছু ডিলার তাদের অনিয়ম অব্যাহত রাখেন বিধায় ১৭ সেপ্টেম্বর বেশি দামে সার বিক্রি করা, মূল্য তালিকা না টাঙানোসহ বিভিন্ন অনিয়মে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে মেসার্স শয়ন ট্রেডার্সসহ কয়েকজন সার ব্যবসায়ীকে জরিমানা করেন। তারপরও সংশোধিত না হয়ে ডিলাররা সরকারি নীতিমালা ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের আদেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে অপরাধের ধারা অব্যাহত রাখার স্বার্থে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অনৈতিক প্রচারণা শুরু করেন। এসব বিষয়সহ তিন ডিলারের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অভিযোগ উত্থাপন করেন।

মেসার্স শয়ন ট্রেডার্সের বিরুদ্ধে অভিযোগ, ২০ আগস্ট তার গুদাম পরিদর্শনকালে দেখা যায় তিনি আগমনিবার্তা জমা দেয়া ১৭ মেট্রিকটন ডিএপি সার গুদামে তোলেন নি। এতে প্রতীয়মান হয় ওই সার তিনি বাইরে বিক্রি করে দিয়েছেন। এ ঘটনায় তার দোকান বন্ধ রাখার নির্দেশ প্রদান করা হয়। কিন্ত তিনি নির্দেশ অমান্য করে দোকান খুলে রেখে ক্রয়বিক্রয় অব্যাহত রাখেন। 

গত ১৭ সেপ্টেম্বর সরকার নির্ধারিত মূল্যের অধিক মূল্যে সার বিক্রির অপরাধে তাকে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে জরিমানা করা হয়। তিনি ধারাবাহিকভাবে অপরাধ অব্যাহত রেখেছেন। ইউনুচ আলীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তার উপজেলার চাঁদপাড়া বাজারে অবস্থিত সার গুদামটি ৫০ মেঃ টন ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন নয়। তার কোন বিক্রয় কেন্দ্র নেই। তার ক্ষুদ্র গুদামটি কখনই খোলা পাওয়া যায় না বিধায় কৃষকরা বা খুচরা সার বিক্রেতারা তার কাছ থেকে সঠিকভাবে সার ক্রয় করতে পারে না। তার উত্তোলনকৃত সারের অধিকাংশই তিনি গুদামে উত্তোলন না করে অন্য কোথাও বিক্রি করে দেন। 

ফরিদুল ইসলামের বিরুদ্ধেও অভিযোগ তার পাতিবিলা বাজারে অবস্থিত সার গুদামটি ৫০ মেঃ টন ধারণক্ষমতা সম্পন্ন নয়। তার কোন বিক্রয় কেন্দ্র নেই। তার ক্ষুদ্র গুদামটি কখনই খোলা পাওয়া যায় না বিধায় কৃষকরা বা খুচরা সার বিক্রেতারা তার কাছ থেকে সঠিকভাবে সার ক্রয় করতে পারে না। তার উত্তোলনকৃত সারের অধিকাংশই তিনি গুদামে উত্তোলন না করে অন্য কোথাও বিক্রি করে দেন। এছাড়া তিনজনের বিরুদ্ধেই অভিযোগ সরকারী নীতিমালা ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের আদেশকে অবজ্ঞাপূর্বক অপরাধের ধারা অব্যাহত রাখার স্বার্থে স্থানীয় কর্তপক্ষের প্রকাশ্য বিরোধিতা করার অভিযোগ আনা হয়েছে।

এসব বিষয় নিয়ে উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির উপদেষ্টা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ ড. মোস্তানিছুর রহমান, ভাইস চেয়ারম্যান ও উপজেলা যুবলীগের আহবায়ক দেবাশীষ মিশ্র জয়, সদস্য চৌগাছা সদর ইউপি চেয়ারম্যান ও উপজেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি, প্রেসক্লাবের প্রতিনিধি অমেদুল ইসলাম, উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা এম. ছালাহউদ্দিন প্রমুখ অনিয়মের সাথে জড়িত ডিলারদের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার দাবি করেন। 

তবে কমিটির সদস্য উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ফুলসারা ইউপি চেয়ারম্যান ও উপজেলা ফার্টিলাইজারি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী মাসুদ চৌধুরী বলেন সরকারের ভাবমুর্তি অক্ষুন্ন রাখতে নিয়মকানুন মেনে ডিলারদের ব্যবসা পরিচালনা করতে হবে। তিনি অভিযুক্ত ডিলারদের নিয়ে আরেকবার মিটিং করে কিছুদিন সময় দেয়া যেতে পারে বলে মত দেন। ফার্টিলাইজারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ইউনুচ আলী তার বিষয়টি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখার জন্য সভায় অনুরোধ করেন।

তবে সভায় উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির অধিকাংশ উপদেষ্টা ও সদস্যরা একমত পোষণ করায় অভিযুক্ত তিন ডিলারের ডিলারশিপ বাতিলের প্রস্তাব জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

এদিকে এই রেজুলেশন জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ার পর থেকেই উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সদস্য সচিব উপজেলা কৃষি অফিসারকে মোবাইল ফোনে ও সরাসরি থ্রেট করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রইচ উদ্দিন। 

তিনি মোবাইল ফোনে জানান ‘এ বিষয়ে বিভিন্নজন বিভিন্নভাবে কথা বলছেন, কেউ কেউ প্রচ্ছন্ন হুমকিও দিচ্ছেন। যাতে তিনি নিরাপত্তাহীনতা বোধ করছেন।


   আরও সংবাদ